Skip to content

Tachyon

কল্পনার বিজ্ঞান

মাইক্রোপ্লাস্টিক একটা অসভ্য 

আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত যে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ ঘটে চলেছে, তার সবচেয়ে নীরব অথচ মারাত্মক রূপটি হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক। বিজ্ঞানের ভাষায়, ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাগুলোকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়।1 এই কণাগুলো এতই ক্ষুদ্র যে অনেক সময় খালি চোখে এদের অস্তিত্ব টেরই পাওয়া যায় না। বর্তমান বিশ্বে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব এক কথায় আঁতকে ওঠার মতো। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়া2 থেকে শুরু করে মহাসাগরের গভীরতম স্থান মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশ3– এমন কোনো দুর্গম জায়গা অবশিষ্ট নেই, যেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের আগ্রাসন পৌঁছায়নি।

কারখানায় উৎপাদিত সরাসরি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যাকে প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। দৈনন্দিন ব্যবহৃত প্লাস্টিক সামগ্রী রোদের তাপ, সমুদ্রের ঢেউ ও প্রাকৃতিক ঘর্ষণের ফলে ভেঙে সৃষ্ট প্লাস্টিক-কে সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাষ্টিক একসাথে বিশ্বজুড়ে মাটি, পানি ও বাতাসের সাথে মিশে ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রকে চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি অ্যান্টার্কটিকার বরফের আদিম স্তরে, মানুষের রক্তে4 এবং এমনকি মাতৃগর্ভের প্লাসেন্টাতেও5 মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এর মানে হলো, একটি অনাগত শিশু পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার শরীরে প্লাস্টিকের দূষণ নিয়ে বেড়ে উঠছে, যা বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য এক অভূতপূর্ব সতর্কবার্তা। 

দৈনন্দিন জীবনে আমরা এমন অনেক জিনিস ব্যবহার করি, যা থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের অজান্তেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে ছড়াচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের শরীরেই প্রবেশ করছে। আমরা সকালে যে টুথপেস্ট বা ফেসওয়াশ ব্যবহার করি, তার অনেকগুলোতে ‘মাইক্রোবিডস’ নামক অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা থাকে6। এছাড়া ফাস্ট ফ্যাশনের যুগে পলিয়েস্টার বা সিনথেটিক কাপড় ধোয়ার সময় প্রতিটি ওয়াশে লাখ লাখ মাইক্রোফাইবার পানিতে মিশে যায়7। রাস্তার উপর দিয়ে গাড়ি চলার সময় টায়ার ক্ষয়ে গিয়ে যে ধুলো তৈরি হয়, এমনকি শখের বশে টি-ব্যাগ গরম পানিতে ডোবানোর ফলেও কোটি কোটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা নির্গত হয়।8

এই কণাগুলো সরাসরি বা ড্রেনের পানির মাধ্যমে খাল-বিল ও নদীতে গিয়ে পড়ে। সামুদ্রিক মাছ, ঝিনুক ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এগুলোকে প্ল্যাঙ্কটন বা খাবার ভেবে খেয়ে ফেলে। পরবর্তীতে সেই মাছ যখন আমাদের প্লেটে আসে, তখন খাদ্যচক্রের হাত ধরে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করে।6  

মানবদেহে এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ এবং সুদূরপ্রসারী। শরীরে প্রবেশের পর এই ক্ষুদ্র কণাগুলো কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে তীব্র বাধা সৃষ্টি করে। এগুলো শরীরে ‘এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর’ বা হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্টকারী হিসেবে কাজ করে। এর ফলে প্রজননতন্ত্রের সমস্যা, থাইরয়েডের জটিলতা এবং শিশুদের স্নায়বিক বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।9 মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাগুলো এতটাই ছোট যে এরা অনেক সময় অন্ত্রের দেয়াল ভেদ করে রক্তস্রোতে মিশে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে শরীরে এই প্লাস্টিক জমতে থাকলে তা কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করে এবং ডিএনএ-তে মিউটেশন বা জিনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে।1 শুধু তাই নয়, মাইক্রোপ্লাস্টিকের পৃষ্ঠতল অনেকটা স্পঞ্জের মতো কাজ করে। এটি পরিবেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর ভারী ধাতু এবং বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ শোষণ করে সরাসরি মানবদেহে পাচার করে দেয়।5

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণার চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক হলেও, আশার কথা হলো সাম্প্রতিক সময়ে এটি নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বেশ গতি পেয়েছে। আমাদের দেশের গবেষকরা মূলত বঙ্গোপসাগরের জলজ প্রাণী, বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া এবং চিংড়ির পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়াবহ উপস্থিতি নিয়ে নিবিড় কাজ করছেন। এছাড়া বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, মেঘনা ও হালদার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানি এবং পলিমাটিতে কী পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হচ্ছে, তা নিয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে। 

চমকে ওঠার মতো তথ্য হলো, বাজারে বিক্রি হওয়া সাধারণ প্যাকেটজাত লবণ6, এমনকি ঢাকার রাস্তার ধুলাবালিতেও উচ্চমাত্রায় পলিইথিলিন এবং পলিপ্রোপাইলিন জাতীয় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।10 তবে গতানুগতিক এই গবেষণাগুলোর বাইরে বর্তমানে জনস্বাস্থ্য ও অণুজীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ নতুন ও অনন্য একটি গবেষণার দিক উন্মোচিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পানিতে ভাসমান মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলো বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আশ্রয়স্থল বা ‘বায়োফিল্ম’ হিসেবে কাজ করে।11 এই প্লাস্টিক কণার গায়ে যখন নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধে এবং নিজেদের মধ্যে জিন বিনিময় করে, তখন তারা খুব সহজেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) অর্জন করে।11 বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার এমনিতেই একটি বড় স্বাস্থ্য সংকট, সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের এই সুপারবাগ বা প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার নীরব বাহক হয়ে ওঠার বিষয়টি পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক নতুন মাত্রার হুমকির সংকেত দিচ্ছে।

যেকোনো নতুন বৈজ্ঞানিক সংকট বা অজানা বিষয় সামনে এলে আমাদের দেশে কিছু গুজব বা ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা, আর মাইক্রোপ্লাস্টিকও তার ব্যতিক্রম নয়। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘প্লাস্টিকের চাল’ বা ‘প্লাস্টিকের ডিম’ নিয়ে একটি বিশাল গুজব দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ভুগতে শুরু করেছিল যে অসাধু ব্যবসায়ীরা কারখানায় আস্ত প্লাস্টিকের চাল বানিয়ে বাজারের সাধারণ চালের সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে। মূলত, খাদ্যচক্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অনুপ্রবেশের বৈজ্ঞানিক খবরটি সাধারণ মানুষের কাছে ভুলভাবে এবং অতিরঞ্জিত হয়ে উপস্থাপিত হওয়ার ফলেই এমন গণ-আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল।12 মানুষ বুঝতে পারেনি যে প্লাস্টিক আমরা সরাসরি চাল বা ডিমের আকৃতিতে চিবিয়ে খাচ্ছি না, বরং তা খাচ্ছি আণুবীক্ষণিক কণা হিসেবে, যা মাটি বা পানির মাধ্যমে কৃষিজাত পণ্য ও মাছের টিস্যুর ভেতরে মিশে থাকছে। 

আরেকটি অত্যন্ত প্রচলিত গুজব বা ভ্রান্ত ধারণা হলো- পানি খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে পান করলেই বোধহয় মাইক্রোপ্লাস্টিক নষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবে প্লাস্টিকের গলনাঙ্ক অনেক বেশি হওয়ায় সাধারণ তাপমাত্রায় পানি ফোটালে মাইক্রোপ্লাস্টিক মোটেও দূর হয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা পানিতে থাকা অন্যান্য রাসায়নিকের সাথে বিক্রিয়া করে পানিকে আরও বেশি বিষাক্ত করে তুলতে পারে।6 এর পাশাপাশি অনেকেই মনে করেন যে মিনারেল ওয়াটার বা বোতলজাত পানি বোধহয় মাইক্রোপ্লাস্টিক মুক্ত এবং শতভাগ নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। গবেষণায় দেখা গেছে প্লাস্টিকের বোতলে থাকা পানিতে টিউবওয়েল বা কলের পানির চেয়ে বহুগুণ বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে, কারণ বোতলের নিজস্ব প্লাস্টিক ক্ষয়েই প্রতিনিয়ত পানিতে কণা মিশতে থাকে।7 আবার অনেকের ধারণা, শুধু শহরাঞ্চলেই মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বৃষ্টির পানির সাথেও মেঘ থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটিতে ঝরে পড়ছে, যা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের কৃষিব্যবস্থা ও বিশুদ্ধ বাতাসকেও সমানভাবে দূষিত করছে।6

সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, বাংলাদেশের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ মোকাবেলা করা এক বিশাল এবং বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত নয় এবং যত্রতত্র সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক বা একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ফেলার সংস্কৃতি এই সমস্যাকে প্রতিদিন আরও ঘনীভূত করছে। একদিকে যেমন উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ারের সাথে ভেসে আসা প্লাস্টিক বর্জ্যের পাহাড় জমছে, অন্যদিকে তেমনি আমাদের দৈনন্দিন আহারের সাথে নীরবে শরীরে প্রবেশ করছে বিষাক্ত কণা। এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শুধুমাত্র আইন করে পলিথিন নিষিদ্ধ করাই যথেষ্ট নয় বরং প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা। সেই সাথে, আমাদের দেশের নিজস্ব সম্পদের প্রেক্ষাপটে পাটের মতো পরিবেশবান্ধব, বায়োডিগ্রেডেবল বা পচনশীল বিকল্প জিনিস উদ্ভাবন ও প্রসারে জোর দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিকের এই আগ্রাসন কেবল একটি সাধারণ পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি সুদূরপ্রসারী জনস্বাস্থ্য সংকট। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস পরিবর্তন, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনা, বিজ্ঞানভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী ও কঠোর পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল আগামী প্রজন্মকে মাইক্রোপ্লাস্টিকের এই অদৃশ্য ও ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র

  1. Kadac-Czapska, K., Ośko, J., Knez, E., & Grembecka, M. (2024). Microplastics and oxidative stress—current problems and prospects. Antioxidants, 13(5), 579. ↩︎
  2. Napper, I. E., Davies, B. F., Clifford, H., Elvin, S., Koldewey, H. J., Mayewski, P. A., … & Thompson, R. C. (2020). Reaching new heights in plastic pollution—preliminary findings of microplastics on Mount Everest. One Earth, 3(5), 621-630. ↩︎
  3. Peng, X., Chen, M., Chen, S., Dasgupta, S., Xu, H., Ta, K., … & Bai, S. (2018). Microplastics contaminate the deepest part of the world’s ocean. Geochem. Perspect. Lett, 9(1), 1-5. ↩︎
  4. Leslie, H. A., Van Velzen, M. J., Brandsma, S. H., Vethaak, A. D., Garcia-Vallejo, J. J., & Lamoree, M. H. (2022). Discovery and quantification of plastic particle pollution in human blood. Environment international, 163, 107199. ↩︎
  5. Ragusa, A., Svelato, A., Santacroce, C., Catalano, P., Notarstefano, V., Carnevali, O., … & Giorgini, E. (2021). Plasticenta: First evidence of microplastics in human placenta. Environment international, 146, 106274. ↩︎
  6. Kumar, A., & Ram, K. (2024). Microplastics in different environmental matrices: Co-Contaminants and its monitoring techniques. Water, Air, & Soil Pollution, 235(10), 673. ↩︎
  7. Mason, S. A., Welch, V. G., & Neratko, J. (2018). Synthetic polymer contamination in bottled water. Frontiers in chemistry, 6, 407. ↩︎
  8. Hernandez, L. M., Xu, E. G., Larsson, H. C., Tahara, R., Maisuria, V. B., & Tufenkji, N. (2019). Plastic teabags release billions of microparticles and nanoparticles into tea. Environmental science & technology, 53(21), 12300-12310. ↩︎
  9. Campanale, C., Massarelli, C., Savino, I., Locaputo, V., & Uricchio, V. F. (2020). A detailed review study on potential effects of microplastics and additives of concern on human health. International journal of environmental research and public health, 17(4), 1212. ↩︎
  10. Arafat, M. Y., Alam, M. S., Saha, B., Bashar, M. S., Bhuiyan, M. N. H., & Moniruzzaman, M. (2025). Urban Atmospheric Microplastic Distribution and Potential Health Impact in Dhaka City, Bangladesh. Journal of Hazardous Materials: Plastics, 100029. ↩︎
  11. Zettler, E. R., Mincer, T. J., & Amaral-Zettler, L. A. (2013). Life in the “plastisphere”: microbial communities on plastic marine debris. Environmental science & technology, 47(13), 7137-7146. ↩︎
  12. Subedar, A. (2017). Why people believe the myth of ‘plastic rice’. BBC Trending. Available online: http://www. bbc. com/news/blogs-trending-40484135. ↩︎

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha