মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে অনেকে জমি দখলের আরেকটি খবর হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এর আসল ক্ষতি মাপতে হবে স্বাস্থ্যের দিক থেকে। পঞ্চাশ বছর ধরে নামমাত্র খরচে যে কেন্দ্র গরিব মা ও শিশুদের সেবা দিয়েছে, তার ভাঙা মানে শুধু দালান ভাঙা নয়। এতে টিকা নষ্ট হয়েছে, শিশুদের টিকার রেকর্ড হারিয়েছে, আর গর্ভবতী মায়েদের একটা ভরসার জায়গাও হারিয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন একটাই। এই ক্ষতি কীভাবে সামলানো যায়, আর পরেরবার এমন হলে আমরা কী করব?
আগে টিকার কথা বলি। বেশিরভাগ টিকা ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হয়। এর বাইরে গেলে টিকা তার কার্যকারিতা হারায়। কিছু টিকা আবার বেশি ঠান্ডায় জমে গেলেও নষ্ট হয়। ফ্রিজ থেকে বের করা বা মেঝেতে পড়ে থাকা টিকা তাই কোনোভাবেই শিশুকে দেওয়া যাবে না। এগুলো নিয়ম মেনে ফেলে দিতে হবে। এখানে “একটু দেখি কাজ করে কি না” ধরনের চিন্তার জায়গা নেই। নষ্ট টিকা দিলে শিশু ভাবে সে সুরক্ষিত, অথচ আসলে সে সুরক্ষিত নয়।
তার চেয়েও বড় ক্ষতি টিকার রেজিস্টার হারানো। কোন শিশু কোন টিকা পেয়েছে, কোনটা বাকি, সবই ওই খাতায় লেখা ছিল। খাতা না থাকলে অনেক শিশুর পরের ডোজ কেউ মনে করিয়ে দেবে না। হামের মতো রোগে এটা বিপজ্জনক। হাম খুব সংক্রামক রোগ। এলাকায় প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুর টিকা থাকলে তবেই সবাই নিরাপদ থাকে। এর নিচে নামলে যে শিশুরা টিকা পায়নি, তারা তো ঝুঁকিতে পড়েই, ছোট শিশুরাও পড়ে, যাদের এখনো টিকার বয়স হয়নি। হামে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহও হতে পারে। অপুষ্ট শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।
এখন কার কী করা উচিত। প্রথম দায়িত্ব সরকারের, আর তার প্রথম কাজ নিরাপত্তা। এত বড় ভাঙচুর পুলিশের নজর এড়িয়ে হওয়ার কথা নয়। কীভাবে হলো, কেন সময়মতো থামানো গেল না, সেই প্রশ্নের স্বচ্ছ তদন্ত দরকার। যারা এর নির্দেশ দিয়েছে আর যারা করেছে, দুই পক্ষই আইনের আওতায় আসা উচিত। দলীয় পরিচয় এখানে বিবেচনায় আসার কথা নয়। রাজনৈতিক দলগুলোরও এখানে দায় আছে। নিজেদের লোক জড়িত থাকলে বহিষ্কারের পাশাপাশি তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়াটাই আসল পরীক্ষা।
দ্বিতীয় দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আর সিটি করপোরেশনের। তাদের কাজ হবে দ্রুত, আর এগুলো করতে বড় বাজেট লাগে না। এলাকায় অস্থায়ী টিকাকেন্দ্র চালু করতে হবে, যাতে হাম-রুবেলা কর্মসূচি পিছিয়ে না যায়। হারানো রেকর্ড নতুন করে বানাতে হবে। এর জন্য আশপাশের কেন্দ্রের তথ্য, ইপিআই কর্মীদের নিজস্ব তালিকা, জন্মনিবন্ধনের তথ্য আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ কাজে লাগানো যায়। অভিভাবকদের কাছে টিকা কার্ড থাকার কথা। কার্ডের ছবি বা নম্বর দেখে অনেক তথ্য উদ্ধার হবে। যে শিশুর তথ্য একেবারেই পাওয়া যাবে না, তাকে টিকা না পাওয়া ধরে নিয়েই টিকা দিতে হবে। বাংলাদেশের নিয়মে শিশু জন্মের পর বিসিজি পায়, তারপর ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহে পেন্টা ও অন্য টিকা, আর ৯ মাস ও ১৫ মাসে হাম-রুবেলা। কোনটা বাদ গেছে, সেটা ধরে ধরে পূরণ করা যায়। অনেকে ভয় পান যে ভুলে দুবার টিকা পড়ে গেলে ক্ষতি হবে। হাম-রুবেলার মতো টিকায় বাড়তি ডোজ সাধারণত নিরাপদ, আর বাদ পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তার চেয়ে অনেক বড়।
গর্ভবতী মায়েদের জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা লাগবে। আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন গেছে, কিন্তু প্রসবপূর্ব সেবা বন্ধ থাকা চলবে না। আশপাশের সরকারি হাসপাতাল বা কমিউনিটি ক্লিনিকে আপাতত বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দরকার হলে ভ্রাম্যমাণ আল্ট্রাসনোগ্রাম দল পাঠানো যায়। এখানে মনে রাখা দরকার, গর্ভাবস্থায় অন্তত চারবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। রক্তক্ষরণ, তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, মুখ বা হাত ফুলে যাওয়া, কিংবা বাচ্চার নড়াচড়া কমে যাওয়া, এগুলো বিপদের লক্ষণ। এমন হলে অপেক্ষা না করে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যেতে হবে।
সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের জন্য কিছু সহজ পরামর্শ আছে। শিশুর টিকা কার্ড থাকলে সেটা যত্ন করে রাখুন, আর এখনই মোবাইলে একটা ছবি তুলে রাখুন। কার্ড হারিয়ে গেলে ঘাবড়াবেন না। কাছের সরকারি টিকাকেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে যান, আর বলুন কোন টিকা কবে পেয়েছে মনে আছে। হামের লক্ষণ, যেমন জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হওয়া আর শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে শিশুকে আলাদা রাখুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। হাম হলে ভিটামিন এ দেওয়া উপকারী। গর্ভবতী মায়েদের হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া যায় না, তাই তাঁদের উচিত সংক্রমিত কারও কাছ থেকে দূরে থাকা।
এবার ভবিষ্যতের কথা। এমন ঘটনা আবার ঘটলে কী করা উচিত, সেটা আগে থেকে ঠিক করা না থাকলে প্রতিবার আমরা দিশেহারা হব। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় তিনটা কাজ জরুরি। পুলিশ ও প্রশাসনকে জানানো, টিকার যে অংশ অক্ষত আছে তা নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া, আর নষ্ট টিকার হিসাব রাখা। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অস্থায়ী কেন্দ্র চালু করা, আর কোন কোন শিশু ঝুঁকিতে আছে তার তালিকা বানানো। এক সপ্তাহের মধ্যে ঘাটতি পূরণের টিকাদান শুরু হওয়া উচিত।
এর জন্য কিছু স্থায়ী ব্যবস্থাও দরকার। টিকার রেজিস্টার শুধু খাতায় না রেখে ডিজিটালভাবেও রাখতে হবে। সরকারের ইপিআই ডেটাবেস আছে, কিন্তু ছোট কেন্দ্রগুলো প্রায়ই খাতায় লেখে। প্রতি মাসে খাতার ছবি তুলে জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেই অনেক ক্ষতি এড়ানো যায়। প্রতিটা কেন্দ্রে ফ্রিজ বিকল বা জরুরি অবস্থার জন্য কোল্ড বক্স আর বিকল্প জায়গার পরিকল্পনা থাকা দরকার। আর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তাকে আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে, কারণ হাসপাতাল ও ক্লিনিকে হামলা সবচেয়ে দুর্বলদের ওপর হামলা।
একটা সমাজ কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় সে তার মা ও শিশুদের কীভাবে রক্ষা করে। দখল, ক্ষমতা আর রাজনীতির লড়াইয়ে তাদের স্বাস্থ্য যেন কখনো বলি না হয়। সরকার, দল আর আমরা সবাই যদি এখনই দায়িত্ব নিই, তাহলে অন্তত পরের শিশুটি টিকা না পেয়ে অসুস্থ হবে না।
