প্রতি বছর বর্ষা এলেই বাংলাদেশে একটা চেনা আতঙ্ক নতুন করে ফিরে আসে, নাম তার ডেঙ্গু। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়।1 স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্তই দেশের ৬৪টি জেলাতেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ, আর মৃত্যু হয়েছে দেড় শতাধিক জনের।2 এবারের হিসাব বলছে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি, তবে মৃত্যুর দিক থেকে নারীদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি বলে সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।3
সরকার নিজেই বলছে, সেপ্টেম্বরের শেষ আর অক্টোবরের শুরুতে অন্তত পনেরোটি জেলায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।4 এই খবর শুনলে মনে পড়ে যায় ২০২৩ সালের সেই ভয়াবহ বছরের কথা। সেই বছর সরকারি হিসাবেই তিন লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন, প্রাণ গিয়েছিল সতেরো শতাধিক মানুষের, যা বিশ্বে সেই বছরের সর্বোচ্চ মৃত্যুহারের রেকর্ড গড়েছিল।5
ডেঙ্গু ঠিক কীভাবে ছড়ায়, সেটা বোঝা জরুরি। Aedes aegypti আর Aedes albopictus নামের দুই ধরনের মশা এই ভাইরাস বহন করে। আক্রান্ত মানুষকে কামড়ানোর পর মশার শরীরে ভাইরাস বংশবিস্তার করে, এরপর সেই মশা যখন অন্য কাউকে কামড়ায়, তখনই ভাইরাস নতুন শরীরে প্রবেশ করে।1 মজার বিষয় হলো, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি আলাদা ধরন আছে, যেগুলোকে বলা হয় DENV-1, DENV-2, DENV-3 আর DENV-4।1 একবার কোনো একটা ধরনে আক্রান্ত হলে শরীরে সেই নির্দিষ্ট ধরনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, পরে যদি ভিন্ন কোনো ধরনের ভাইরাস দ্বিতীয়বার শরীরে ঢোকে, তাহলে উল্টো বিপদ আরও বেড়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় অ্যান্টিবডি-নির্ভর সংক্রমণ বৃদ্ধি বা ADE। প্রথমবারের অ্যান্টিবডিগুলো নতুন ভাইরাসকে পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না, উল্টো ভাইরাসকে কোষের ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করে ফেলে, ফলে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে রোগ আরও গুরুতর রূপ নিতে পারে।6
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে সঞ্চালিত ভাইরাসের ধরন বছরের পর বছর ধরে বদলে গেছে। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে DENV-2 ধরনটাই বেশি পাওয়া যেত।7 এরপর ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রাধান্য পায় DENV-3।8 ২০২২ সালে আবার নতুন করে দেখা যায় DENV-4-এর প্রত্যাবর্তন, যা সেই বছরের অস্বাভাবিক দেরিতে শুরু হওয়া প্রাদুর্ভাবের একটা বড় কারণ বলে মনে করেন গবেষকরা।9 আর ভয়াবহ ২০২৩ সালে আবার ফিরে আসে DENV-2, তবে একেবারে নতুন এক ধরনে, যা আগের চেয়ে বেশি মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।10 অর্থাৎ একই জনগোষ্ঠী বারবার আলাদা আলাদা ধরনের ভাইরাসের মুখোমুখি হচ্ছে, আর এভাবেই ভবিষ্যতে আরও গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে।8

সাধারণ ডেঙ্গু জ্বরে হঠাৎ তীব্র জ্বর ওঠে, সঙ্গে থাকে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরে আর গিঁটে গিঁটে অসহ্য ব্যথা, বমিভাব এবং চামড়ায় লালচে র্যাশ।1 বেশিরভাগ মানুষ সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু আসল বিপদ লুকিয়ে থাকে জ্বর কমে যাওয়ার পরের চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টায়। এই সময় পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত, শরীর হঠাৎ অস্থির বা নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, এসব লক্ষণ দেখা দিলে বুঝতে হবে রোগী গুরুতর ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের দিকে যাচ্ছেন। এমন অবস্থায় দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি, কারণ সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে এই পর্যায় থেকেই মৃত্যু ঘটতে পারে ।1
জ্বর হলেই যে সেটা ডেঙ্গু, তা নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায় রক্ত পরীক্ষা। জ্বরের প্রথম কয়েকদিনে সাধারণত NS1 অ্যান্টিজেন টেস্ট করানো হয়, আর পরবর্তী সময়ে আইজিএম ও আইজিজি অ্যান্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়।1 হালকা উপসর্গের রোগী সাধারণত বাসায় থেকেই সেরে উঠতে পারেন। সেক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার খাওয়া, ভরপুর বিশ্রাম নেওয়া এবং জ্বর বা ব্যথার জন্য শুধু প্যারাসিটামল ব্যবহার করাই নিরাপদ বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি কিছুদিন পরপর প্লাটিলেট আর হেমাটোক্রিটের মাত্রা পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শরীরের অবস্থা নজরে রাখাটাও জরুরি।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি এতটা উদ্বেগজনক হওয়ার পেছনে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু কারণ দেখছেন। মজার বিষয় হলো, ঢাকা আর ভারতের কলকাতা প্রায় একই রকম ভৌগোলিক পরিবেশে অবস্থিত, অথচ কলকাতা ডেঙ্গু অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে, যেখানে ঢাকায় প্রতি বছরই সংক্রমণ বাড়ছে।4 গত আড়াই দশকে মশা নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগের অভাব, অপরিকল্পিত ও দ্রুত নগরায়ণ, অনিয়মিত ও দীর্ঘায়িত বৃষ্টির মৌসুম এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেই এর জন্য মূলত দায়ী করা হচ্ছে।11 ফুলের টব, এসির ট্রে, ছাদে ফেলে রাখা পাত্র কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি, এসব জায়গাতেই এডিস মশা ডিম পাড়ে, আর শহরাঞ্চলে এমন উৎসের কোনো অভাব নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টির ধরন আর তাপমাত্রা আগের চেয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েছে, ফলে এডিস মশার প্রজননের সময়কালও আগের চেয়ে দীর্ঘ হয়ে গেছে। এক সময় ডেঙ্গুকে শুধু জুন থেকে সেপ্টেম্বরের রোগ বলে ধরা হতো, কিন্তু এখন নভেম্বর-ডিসেম্বরেও নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন হাজারখানেক নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় সরকারি হাসপাতালগুলোর শয্যা আর চিকিৎসাকর্মীদের ওপরও প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে রাজধানীর বাইরের হাসপাতালগুলোয়। ফলে ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষার কয়েক মাসের রোগ নয়, প্রায় সারা বছরের একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেকোনো স্বাস্থ্য সংকট এলেই বাংলাদেশে কিছু গুজব বা ভুল ধারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ডেঙ্গুও তার ব্যতিক্রম নয়। সবচেয়ে পুরনো এবং প্রচলিত গুজবটি হলো, পেঁপে পাতার রস খেলে নাকি রক্তে প্লাটিলেট হু হু করে বেড়ে যায়। বাস্তবতা হলো, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত প্লাটিলেট কমতে থাকে, এরপর ছয়-সাত দিন থেকে এমনিতেই আবার বাড়তে শুরু করে। পেঁপে পাতা খাওয়া বা না খাওয়ায় এখানে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কোনো প্রভাব নেই বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।12
আরেকটা প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, প্লাটিলেট কমে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে রক্ত বা প্লাটিলেট দিতে হবে। বাস্তবে রোগীর সক্রিয় রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিনা, রক্তচাপ কেমন আর সার্বিক শারীরিক অবস্থা কেমন, এসব বিবেচনা করেই চিকিৎসকরা প্লাটিলেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, শুধু সংখ্যা কমে যাওয়াটাই তার একমাত্র কারণ নয়।13 এছাড়া অনেকের ধারণা, ডেঙ্গু হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া প্রয়োজন। অথচ এটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই অ্যান্টিবায়োটিকে তেমন কোনো কাজ হয় না। বরং নিজের মতো করে ব্যথার ওষুধ, বিশেষ করে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ খেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি উল্টো বেড়ে যেতে পারে।14
আরেকটা ভুল ধারণাও প্রায়ই শোনা যায়, তা হলো ডেঙ্গু নাকি শুধু নোংরা পরিবেশে বা বস্তি এলাকায় হয়। অথচ পরিষ্কার পানিতেও এডিস মশা ডিম পাড়ে, তাই অভিজাত এলাকার ফুলের টব বা ছাদবাগানও এর প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে অনেকে মনে করেন মশা মারার স্প্রে বা কয়েল ব্যবহার করলেই বুঝি পুরোপুরি নিরাপদ থাকা যায়। বাস্তবে শুধু স্প্রে বা কয়েলের ওপর নির্ভর না করে বাড়ির চারপাশে পানি জমতে না দেওয়াটাই বেশি কার্যকর।
সবমিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের জন্য ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষার কয়েক মাসের রোগ নয়, বরং একটা দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ কিংবা সহজলভ্য টিকা এখনো এদেশে নিয়মিতভাবে চালু হয়নি, তাই প্রতিরোধই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, মশারি ব্যবহার করা, আর জ্বর হলে গুজবে কান না দিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই আসলে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। একইসঙ্গে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা, আর তৃণমূল পর্যায়ে সত্যিকারের জনসচেতনতা। তবেই প্রতি বছর ফিরে আসা এই আতঙ্ক থেকে আগামী দিনে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র
- Bhatt, S. et al. (2013). The global distribution and burden of dengue. Nature, 496(7446), 504-507. ↩︎
- ডেঙ্গুতে এক দিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণ, মৃত্যু ৮, প্রথম আলো (অনলাইন ভার্শন), ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ↩︎
- সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশি পুরুষ, মৃত্যুতে নারী, রাইজিংবিডি, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ↩︎
- শিশির মোড়ল, আগামী সপ্তাহগুলোতে ১৫ জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি, প্রথম আলো (অনলাইন ভার্শন), ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ↩︎
- Haider N, et al. (2023). Bangladesh’s 2023 Dengue outbreak – age/gender-related disparity in morbidity and mortality and geographic variability of epidemic burdens, International Journal of Infectious Diseases, 136, 1-4 ↩︎
- Guzman, et al. (2013). Secondary infection as a risk factor for dengue hemorrhagic fever/dengue shock syndrome: an historical perspective and role of antibody-dependent enhancement of infection. Arch Virol 158, 1445–1459 ↩︎
- Muraduzzaman AKM, et al (2018). Circulating dengue virus serotypes in Bangladesh from 2013 to 2016. Virus Disease. 29(3):303-307. ↩︎
- Kayesh MEH, et al. (2023). Increasing Dengue Burden and Severe Dengue Risk in Bangladesh: An Overview. Trop Med Infect Dis. 8(1):32. ↩︎
- Haider N, et al. (2023). The 2022 dengue outbreak in Bangladesh: hypotheses for the late resurgence of cases and fatalities. J Med Entomol. 60(4):847-852. ↩︎
- Hasan A, et al. (2024). Resurgence of Dengue Virus Serotype 2: Findings from the 2023 Bangladesh Outbreak. Am J Trop Med Hyg. 111(3):617-621. ↩︎
- Sarker R, et al. (2024) A perspective on the worst ever dengue outbreak 2023 in Bangladesh: What makes this old enemy so deadly, and how can we combat it? Health Sci Rep. 7(5) ↩︎
- সাদী মুহাম্মাদ আলোক, পেঁপে পাতার রস খেলে কি আসলেই প্লাটিলেট বাড়ে, দ্যা ডেইলি স্টার বাংলা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ↩︎
- কখন এবং কেন ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট নিতে হয়? চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ, এখন টিভি, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ↩︎
- ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী, ডেঙ্গু : জ্বর কমলেই বিপদ কাটে না, রূপালী বাংলাদেশ, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ↩︎
