বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, মোটা দাগে প্রায় নবম শ্রেণি থেকেই শিক্ষার্থীরা নিউটনীয় বলবিদ্যায় অভ্যস্ত হতে শুরু করে, মহাকর্ষকে একটি মৌলিক বল হিসেবে চিনতে শুরু করে। এই ধারা চলতে থাকে প্রায় এইচএসসি পর্যন্ত।
কিন্তু যখনই এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের “আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান” অধ্যায়টি পড়া শুরু হয়, প্রথম অবস্থায় একজন নাস্তিকের কাছে ঈশ্বর যেমন অলীক বস্তু, একজন বিজ্ঞানপড়ুয়া শিক্ষার্থীর কাছেও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মৌলিক বিষয়গুলো স্রেফ কিছু অলীক বিষয় বলে মনে হতে পারে। আজকের আলোচনা মূলত মহাকর্ষ বল বনাম মহাকর্ষীয় প্রভাব সম্বন্ধে। মোটা দাগে বললে, নিউটন বনাম আইনস্টাইন সম্পর্কে।
বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের মতে, যদি নির্দিষ্ট ভরসমৃদ্ধ m₁ ও m₂ দুটি বস্তুকে পরস্পর থেকে নির্দিষ্ট r দূরত্বে রাখা হয়, তবে এদের মধ্যে মহাকর্ষীয় বল ক্রিয়া করে। এই বলের মান,
যেখানে G হলো মহাকর্ষীয় ধ্রুবক।
তার প্রদত্ত এই সূত্র থেকে কিছু অনুসিদ্ধান্তে আসা যায় —
- মহাকর্ষীয় বল বস্তুদ্বয়ের ভরের গুণফলের সমানুপাতিক।
- মহাকর্ষীয় বল বস্তুদ্বয়ের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
- দুটি বিন্দু ভরের ক্ষেত্রে মহাকর্ষীয় বল তাদের ভরকেন্দ্রদ্বয়ের সংযোজক সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে।
এখান থেকে খানিকটা গাণিতিক যাত্রা অতিক্রম করে, মহাকর্ষীয় ত্বরণের একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। কোন বস্তুর ওপর মহাকর্ষীয় বল ক্রিয়া করলে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী সেই বস্তু ত্বরণ লাভ করে। পৃথিবীর নিকটবর্তী অঞ্চলে এই ত্বরণকে সাধারণভাবে g দ্বারা প্রকাশ করা হয়, যার মান প্রায় 9.8 m/s²।
বহু বছর ধরে এই ব্যাখ্যা বিজ্ঞানপিপাসুদের মনের খোরাক জুগিয়েছে এবং বস্তুর নিম্নমুখী পতন সম্পর্কে নানা প্রশ্নের বিজ্ঞানসম্মত উত্তর দিয়েছে।
কিন্তু বিপত্তি বাধে যখন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তার জগৎবিখ্যাত ‘জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি’ প্রকাশ করেন। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি, তা হলো আইনস্টাইন নিউটনের তত্ত্বকে সম্পূর্ণভাবপ “ভুল” বলে বাতিল করেননি। বরং দেখিয়েছেন, নিউটনের মহাকর্ষীয় বলের ধারণা একটি নির্দিষ্ট সীমায় অত্যন্ত ভালো অ্যাপ্রোক্সিমেশন হিসেবে কাজ করে, আর অধিক জেনারালাইজড ও গভীর ব্যাখ্যায় মহাকর্ষকে স্পেস-টাইম জিওমেট্রির রেজাল্ট হিসেবে দেখা যায়।
আইনস্টাইনের তত্ত্বানুসারে, মহাবিশ্বের স্থান ও সময় আলাদা কোনো স্বাধীন সত্তা নয়, বরং তারা একত্রে স্পেস-টাইম ফেব্রিক্স গঠন করে। আর ভর-শক্তির উপস্থিতি স্পেস-টাইম জিওমেট্রিকে পরিবর্তিত করে, যাকে আমরা সাধারণভাবে স্পেস-টাইম কার্ভেচার বা স্থান-কালের বক্রতা বলে থাকি।
সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো বস্তুর ভর-শক্তি যত বেশি, তার আশেপাশের স্পেস-টাইম জিওমেট্রিতে পরিবর্তন তত বেশি হতে পারে। তবে আধুনিক ভাষায় শুধু “ভর স্পেস-টাইম ফেব্রিক্স বাঁকায়” বললে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না, কারণ আইনস্টাইনের সমীকরণে ভর-শক্তি, ভরবেগ, চাপ এবং পীড়ন তথা সমষ্টিগতভাবে স্ট্রেস-এনার্জি টেন্সর স্পেস-টাইম কার্ভেচারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তার এই তত্ত্বের একটি বিখ্যাত পরীক্ষামূলক সমর্থন পাওয়া যায় সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। যদি সত্যিই সূর্যের মতো বৃহৎ ভরের কারণে তার আশেপাশের স্পেস-টাইম ফেব্রিক্স বেঁকে যায়, তাহলে সূর্যের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় দূরবর্তী নক্ষত্রের আলোও সেই স্পেস-টাইম ফেব্রিক্সে তৈরি হওয়া কার্ভেচারের মধ্য দিয়ে চলবে। ফলে নক্ষত্রটির আপাত অবস্থান তার প্রকৃত অবস্থান থেকে কিছুটা বিচ্যুত বলে মনে হতে পারে। এই পর্যবেক্ষণের জন্য সূর্যগ্রহণকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, কারণ দিনের আকাশে সূর্যের উজ্জ্বল আলো সরাসরি নক্ষত্রের আলোকে আড়াল করে রাখে। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের উজ্জ্বলতা সাময়িকভাবে অনেক কমে যায়, ফলে সূর্যের কাছাকাছি থাকা দূরবর্তী নক্ষত্রগুলোর আলো পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
১৯১৯ সালের সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণে নক্ষত্রের আলোর এই আপাত বিচ্যুতি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফল দেয়। এটিকে সাধারণ আপেক্ষিকতার একটি ঐতিহাসিক পরীক্ষামূলক সমর্থন হিসেবে ধরা হয়।
অর্থাৎ এখানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো নিউটনের বলেছেন, মহাকর্ষ একটি বল। আর আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তিনি বলেছেন, মহাকর্ষ একটি অন্য ঘটনার প্রভাব, যা মূলত স্থান-কালের বক্র জ্যামিতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, উভয়ের ব্যাখ্যার মধ্যে বিস্তর তফাৎ থাকলেও মহাকর্ষীয় ত্বরণ নিয়ে আমরা একই ধরনের গাণিতিক ফলাফল পেতে পারি, যদিও এর ভৌত ব্যাখ্যা এক নয়। আইনস্টাইন এবং নিউটনের দেওয়া মতামতকে একটি তুল্য পরিবেশে কল্পনা করলেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
ধরা যাক, একজন নভোচারী পৃথিবীর চারদিকে কক্ষপথে ঘুরছেন। নিউটনের দৃষ্টিতে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় বল তার ওপর ক্রিয়া করছে এবং সেই বলই তাকে কক্ষপথে রাখছে। অর্থাৎ তিনি পৃথিবীর দিকে ক্রমাগত মুক্তভাবে পতিত হচ্ছেন। তাই তিনি ওজনহীনতা অনুভব করেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিউটনের তত্ত্বও কিন্তু এই ওজনহীনতাকে ব্যাখ্যা করতে পারে। কারণ “মহাকর্ষীয় বল থাকা” এবং “ওজন অনুভব করা” এই দুটি একই বিষয় নয়। ওজন অনুভব করার জন্য সাধারণত কোনো প্রতিক্রিয়া বল প্রয়োজন। নভোচারী এবং তার মহাকাশযান উভয়েই যখন একই সঙ্গে মুক্ত ভাবে পতিত হতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া বল থাকে না, তাই তারা ওজনহীনতা অনুভব করেন।
অন্যদিকে আইনস্টাইনের দৃষ্টিতে মুক্তভাবে পতনশীল নভোচারী নিজের লোকাল ফ্রেমে কোনো মহাকর্ষীয় বল অনুভব করছেন না। তিনি স্থান-কালের বক্রতার মধ্যে একটি জিওডেসিক পথ অনুসরণ করছেন। অর্থাৎ মুক্তভাবে পতনরত অবস্থাই মূলত স্বাভাবিক বা Force-free Motion-এর কাছাকাছি অবস্থা।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পৃথিবীর পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে আমরা যে প্রায় 9.8 m/s² অভিকর্ষজ ত্বরণ পরিমাপ করি, সেটি আসলে কী?
এখানেই নিউটন ও আইনস্টাইনের ব্যাখ্যার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর পার্থক্যটি দেখা যায়। নিউটনের ভাষায়, পৃথিবী আমাদের ওপর মহাকর্ষীয় বল প্রয়োগ করছে। ফলে আমরা যদি কোনো বাধা ছাড়া পড়তে থাকি, তাহলে প্রায় 9.8 m/s² ত্বরণে পৃথিবীর দিকে পতিত হব। কিন্তু আইনস্টাইনের ভাষায়, আমরা যখন মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছি, তখন আমরা আসলে সেই মুক্ত-পতন ট্র্যাজেক্টরি অনুসরণ করতে পারছি না। পৃথিবীর পৃষ্ঠ আমাদের সেই স্বাভাবিক জিওডেসিক গতি থেকে বিচ্যুত করছে। মাটি আমাদের ওপর একটি অবিলম্ব বল প্রয়োগ করছে, যার ফলে আমরা মুক্তভাবে পতিত হতে পারছি না।
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে, 9.8 m/s² হলো পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছে Free-fall Acceleration-এর নিউটনীয় মান। আর মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের Proper Acceleration-এর মানও প্রায় 9.8 m/s², কিন্তু তার দিক ও ভৌত অর্থ ভিন্ন।
অর্থাৎ, মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি নিজেকে ত্বরণপ্রাপ্ত অবস্থায় অনুভব করেন, কারণ মাটি তাকে তার স্বাভাবিক মুক্ত-পতন ট্র্যাজেক্টরি থেকে ঠেকিয়ে রাখছে। আর একটি মুক্তভাবে পতনরত বস্তু নিজের লোকাল ফ্রেমে সেই অর্থে কোনো Proper Acceleration অনুভব করে না। সুতরাং একই ঘটনাকে দুই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। অর্থাৎ নিউটনের ভাষায়, পৃথিবীর মহাকর্ষীয় বল বস্তুকে ত্বরণ দিচ্ছে। আর আইনস্টাইনের ভাষায়, বস্তুটি যদি মুক্তভাবে পতিত হয়, তবে সে স্থান-কালের বক্রতার মধ্যে একটি জিওডেসিক পথ অনুসরণ করছে আর পৃথিবীর পৃষ্ঠ তাকে সেই জিওডেসিক গতি থেকে বাধ্যতামূলকভাবে সরিয়ে রাখছে।
এখানেই “মহাকর্ষ বল” এবং “মহাকর্ষীয় প্রভাব”-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটি ধরা পড়ে। অর্থাৎ, নিউটনের মহাবিশ্বে মহাকর্ষকে আমরা একটি বল হিসেবে দেখি, আর আইনস্টাইনের মহাবিশ্বে মহাকর্ষীয় ঘটনাকে আমরা স্পেস-টাইম জিওমেট্রির ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করি। দৃষ্টিকোণ ভিন্ন হলেও, দৈনন্দিন জীবনের দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে উভয় তত্ত্বের পূর্বাভাস প্রায় একই ফল দিতে পারে।
