Skip to content

Tachyon

কল্পনার বিজ্ঞান

এআই কি মানুষের মতো গল্প লিখতে পারে?

মানুষের গল্প লেখার শুরু প্রায় চার হাজার বছর আগে — যখন মানুষ লিখতে শিখেছে তখন থেকেই। সেই থেকে মানুষের হাত ধরে রচিত হয়েছে কোটি কোটি গল্প। হাজারখানেক বছরের পথ পাড়ি দিয়ে মানুষ আজ এমন এক যুগে পৌঁছে গেছে, যেখানে মানুষের পাশাপাশি যন্ত্রও চমৎকার গল্প লিখতে পারে। কিন্তু মানুষের লেখা আর যন্ত্র বা AI-এর লেখা গল্পের মধ্যে কি আসলেই কোনো পার্থক্য আছে? আমরা কীভাবে বুঝবো কোনটা মানুষের আর কোনটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৃষ্টি?

২০২৬ সালের মার্চ মাসে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই প্রশ্নটিকে আরও উসকে দেয়। বিশ্বখ্যাত পাবলিশিং হাউজ হাশেত (Hachette) ‘Shy Girl’ নামের একটি ভৌতিক উপন্যাস বাজার থেকে তুলে নিতে বাধ্য হয়। কারণ জানা যায়, এই উপন্যাসটির প্রায় ৭৮% অংশই লেখা হয়েছিল AI দিয়ে! দিন দিন এভাবে মানুষের নামে AI দিয়ে লিখিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যা পাঠকদের চরম বিভ্রান্তিতে ফেলছে। তাহলে এই সমস্যার সমাধান কী?

This image has an empty alt attribute; its file name is image-1.png
২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া ভৌতিক জনরার বই শাই গার্ল এর প্রায় ১৮০০ এর অধিক কপি বিক্রি হওয়ার পর জানা যায়, এর অধিকাংশই এআই দিয়ে লেখা।

বর্তমানে বাজারে বেশ কিছু AI ডিটেক্টর সফটওয়্যার আছে। কিন্তু এগুলো মূলত লেখার বাহ্যিক শৈলী বা স্টাইলের ওপর নির্ভর করে কাজ করে — যেমন শব্দ চয়ন, ব্যাকরণ বা বাক্য গঠন। উদাহরণস্বরূপ, AI লেখাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ‘em-dash’ (—) চিহ্নের ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়া “delve” বা “tapestry”-এর মতো কিছু নির্দিষ্ট শব্দ তারা বারবার ব্যবহার করে। কিন্তু শুধু এই বাহ্যিক দিকগুলো বিশ্লেষণ করে AI ধরা এখন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। কারণ একটু চালাকি করে প্রম্পট দিলেই AI এই শব্দগুলো এড়িয়ে লিখতে পারে। এমনকি বর্তমানের উন্নত মডেল যেমন ChatGPT এখন আর আগের মতো em-dash ব্যবহার করে না বললেই চলে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের লেখার স্টাইল অনুকরণ করার জন্য তৈরি করা বিশেষ লেখার মাধ্যমে এই সাধারণ ডিটেক্টরগুলোর কার্যকারিতা ৯৭% থেকে কমিয়ে মাত্র ৩%-এ নামিয়ে আনা সম্ভব! তাহলে উপায়?

ঠিক এই জায়গাতেই নতুন আশার আলো দেখিয়েছেন গুগল ডিপমাইন্ড (Google DeepMind) এবং ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের (University of Maryland) গবেষকরা। তাঁরা StoryScope নামের একটি অভিনব পদ্ধতি তৈরি করেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, শব্দের বাহ্যিক রূপ বা বাক্য গঠনের চাতুর্য এড়িয়ে, গল্পের মূল “হাড্ডি-মাস” বা ন্যারেটিভ স্ট্রাকচার (Narrative Structure) বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মানুষের লেখা ও AI-এর লেখা আলাদা করা সম্ভব। কিন্তু কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?

  1. যেকোনো গবেষণায় দরকার তথ্য। তো গবেষকেরা 10,272 টা মানুষের লেখা গল্প AI কে দিয়েছে। দিয়ে বলেছে গল্পগুলো বিশ্লেষণ করে একটা prompt লিখতে —যেন সেই prompt-এ ওই গল্পের চরিত্র, প্লট ইত্যাদি বর্ণনা থাকে। যাতে ওই prompt ব্যাবহার করে একি চরিত্র ও একি কাহিনীর গল্প লেখা যায় AI দিয়ে। ফলে AI এর লেখা গল্প ও মানুষের লেখার মধ্যে তুলনা করা যাবে। এরপর ওই prompt দিয়ে Claude Sonnet 4.6, GPT-5.4, Gemini 3 Flash, DeepSeek V3.2, and Kimi K2.5 ব্যাবহার করে মোট 61,608 টা গল্প জেনারেট করা হয় ~5000 শব্দের। 
  2. এবার গবেষকরা চাইলে এইসব গল্পের লেখার স্টাইল বিশ্লেষণ করতে পারতো। কিন্তু আগেই বলেছি এভাবে AI ডিটেক্ট করা সমস্যার। তো এটা না করে তারা গল্প বিশ্লেষণ করে গল্পের ন্যারেটিভ এলিমেন্ট গুলো আলাদা করেছে। ন্যারেটিভ এলিমেন্টগুলো হলো:

    1. চরিত্র: গল্পের চরিত্র ও চরিত্রের সাইকোলজি। এসব চরিত্র গল্পে কীভাবে ভূমিকা রেখেছে — কীভাবে গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। 
    2. ঘটনা ও কার্যকারণ: একটা গল্প সাধারণত অনেকটা ঘটনার সমষ্টি। উনারা দেখেছে একটা ঘটনা আরেক ঘটনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে। কীভাবে একটা ঘটনা আরেকটা ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। 
    3. সময়ের ক্রম: গল্পে সময়ের ক্রম অনেকভাবে হতে পারে। গল্পে একটা ঘটনার পরে আরেকটা ঘটবে — বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে যাবে। আবার গল্পে ঘটনার ক্রম কখনো অতীত থেকে বর্তমান। বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ। আবার ভবিষ্যৎ থেকে অতীতে যেতে পারে। এসব গল্পে সময় সোজাসুজি চলে না। 
    4. উদ্ঘাটন: গল্পে কোন তথ্য গোপন করা হচ্ছে আর সেগুলো কখন প্রকাশ করা হচ্ছে, কখন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছে। 

    এতো গুলো গল্প থেকে ন্যারেটিভ এলিমেন্ট আলাদা করা মানুষের পক্ষে অনেক সময়ের ব্যাপার। সেজন্য তারা GPT-5.1 কে এভাবে prompt করলো যেন গল্প থেকে ন্যারেটিভ এলিমেন্ট আলাদা করা যায়। 
  3. এবার ন্যারেটিভ এলিমেন্টগুলো থেকে তারা আলাদা করলেন কোন ন্যারেটিভ স্টাইল মানুষ ও AI-এর লেখা আলাদা করে। এবং এসব ডাটা ব্যাবহার করে তারা একটা মেশিন লার্নিং মডেল তৈরি করলো—AI লেখা ডিটেক্ট করার জন্য। দেখা গেলো এই মডেল 93.2% macro-F1 স্কোর অর্জন করেছে AI জেনারেট টেক্সট ডিটেক্ট করতে। কোন লেখা কোন AI মডেল লিখেছে তা ডিটেক্ট করতে পারে 68.4% একুরেসিতে। 

কোন ন্যারেটিভ স্টাইল বা চয়েজ মানুষ ও AI-এর লেখা আলাদা করে? 

  1. AI বেশী ব্যাখ্যা করে: দেখা গেছে AI গল্প লেখে বেশী বিশদ আর সুস্পষ্ট করে। বেশী নীতিবাক্য ব্যাবহার করে। আর পুরো গল্প একটা কেন্দ্রীয় নীতির উপরে থাকে। গল্পের ন্যারেটর একাই গল্পের মূলভাব প্রকাশ করে 77% ক্ষেত্রে—মানুষের ক্ষেত্রে সেটা 52%। AI তার সংলাপে প্রায়ই দার্শনিক বিতর্ক (59% vs 34%) ও অন্যের লেখার রেফারেন্স(72% vs 50%)  দেয় কোন নির্দিষ্ট নামযুক্ত করে না। AI পাঠকের অনুমানের উপরে ভরসা না করে নিজেই সব বর্ণনা করে। 
  2. শারীরিক রূপকের বেশী ব্যাবহার:   AI আবেগ প্রকাশ করতে বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা (81% vs. 38% human) ব্যাবহার করে—গন্ধ কেন্দ্রিক চিত্রকল্প (82% vs. 57%) ব্যাবহার করে। এছাড়া চরিত্রের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বর্ণনা করতে করতে পারিপাশ্বিক পরিবেশ ব্যাবহার করে বেশি। দেখা গেছে AI মানসিক অবস্থা ব্যাখ্যা করতে সরাসরি আবেগের নাম উল্লেখ না করে শারীরিক অবস্থা দিয়ে প্রকাশ করে। যেমন যেখানে কোন মানুষ তার চরিত্রের ভয় প্রকাশ করতে লিখতো,” ভয় পেয়েছে”, সেখানে AI ভয় প্রকাশ করে “বুকে চাপ, ঠান্ডা ঘাম, এবং ম্লান হয়ে আসা বাতির আলো” এসব শারীরিক অবস্থা ও পারিপাশ্বিক পরিবেশ দিয়ে। মানুষ ২৯% ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আবেগসূচক শব্দ ব্যবহার করে, যেখানে AI তা করে মাত্র ৮%। 
  3. মানুষ গল্পে বাইরের জগৎ কে বেশী করে যুক্ত করে: AI সাধারণ বাস্তবের কোন ব্রান্ড, স্থান, সৃষ্টিকর্মের নাম এড়িয়ে যায়—এসব বর্ণনা করতে অস্পষ্ট ইঙ্গিতের মধ্যে সীমাবন্ধ থাকে। মানুষেরা অনেক বেশিবার চতুর্থ দেয়াল বা fourth wall ভাঙে (৬৭% বনাম ৩৯%) এবং পাঠককে সরাসরি সম্বোধন করে বেশিবার (২৮% বনাম ৭%)। মানুষ তার লেখায় প্রায় পাঠক-কে যুক্ত করে, মাঝেমধ্যে সম্বোধন করে (যেমন, “প্রিয় পাঠক” আপনাকে উদ্দেশ্য করে বলছি) — কিন্তু AI এমনভাবে লেখে যেন কেউ দেখছে না। 
  4. AI লেখায় বৈচিত্র্য কম: মানুষের লেখা গল্পে বিভিন্ন বিচিত্র জায়গার আনাগোনা বেশি থাকে এবং বর্ণনার তুলনায় সংলাপের অনুপাত অনেক বেশি থাকে। আসল গল্পের সাথে আরও অনেক উপ-গল্প একিভুত থাকে (human 42% vs. 21%)। এছাড়া দেখা যায় মানুষের লেখা গল্পের চরিত্র নৈতিকভাবে বেশী দ্বীধাগ্রস্থ (59% vs. 38%)। 

গল্পের লেখার বাহ্যিক শৈলী বা স্টাইল (যেমন শব্দ বা বাক্য) পরিবর্তন করলেও ভেতরের ন্যারেটিভ বা কাঠামোগত গঠনশৈলী একই থাকে। ফলে স্টাইল পরিবর্তনকারী টুল ব্যবহার করলেও AI ডিটেকশনে কোনো প্রভাব পড়ে না। এছাড়া দেখা গেছে বিভিন্ন AI এর লেখার ধরণ আলাদা—কিন্তু সবার মধ্যে কমন ন্যারেটিভ স্টাইল আছে। 

Claude—ক্লাসিক লেখক। তার লেখা খুব শান্ত—উত্তেজনা খুব বেশি বাড়ে না। সে পুরাতন ও ট্রাডিশনাল স্টাইলে গল্প লেখে। সে তার গল্পে স্বপ্ন বা অলীক কল্পনার দৃশ্য এড়িয়ে চলে এবং কাহিনীর শেষে একটি পরিচ্ছন্ন উপসংহার বা পরিশিষ্ট (Epilogue) যোগ করতে পছন্দ করে।

GPT—সামাজিক লেখক। এটি চরিত্রদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে গুজব ও পরচর্চা ব্যবহার করে। আগে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার স্মৃতিকে কেন্দ্র করে গল্প লেখে। প্লট টুইস্ট দিয়ে পাঠকদের চমকে দিতে পছন্দ করে। 

Gemini—The Dark Writer। প্রায় সব সময় তার গল্প গুলো ডার্ক, দুঃখের ও কোন ভয়ের স্থান নিয়ে হয়। তার গল্প ডার্ক হলেও কাহিনীর সমাপ্তি হয় অত্যন্ত গোছানো, সুসংগত এবং সম্পূর্ণ। চরিত্রগুলো একে অপরের সাথে সরাসরি অনেক কথা বলে। 

এছাড়া DeepSeek—গল্পের একেবারে শুরুতেই চরিত্রগুলোর ইতিহাস ও পটভূমি ব্যাখ্যা করে। Kimi—এর খুব বেশি আলাদা স্টাইল নেই লেখার। এটা কোন ঘটনার মাঝ থেকে গল্প বলা শুরু করে। 

পুরো লেখা নিন্মে উল্লেখ করা গবেষণা পেপারের উপরে লেখা। আমার সাজেশন থাকবে পেপার টা দেখতে—গবেষণার সব ডাটা ও কোড ওপেন সোর্স।  

তথ্যসূত্র

Russell, J., Rajendhran, R., Pham, C. M., Iyyer, M., & Wieting, J. (2026). StoryScope: Investigating idiosyncrasies in AI fiction. arXiv preprint arXiv:2604.03136.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Are you human? Please solve:Captcha