মিতুর বয়স বাইশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, পাশাপাশি একটা পার্ট-টাইম জব ও করে। গত কয়েক মাস ধরে ওর একটাই অভিযোগ, সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে। রাতে ঘুমও ঠিকঠাক হয়, তবু সকালে উঠতে ইচ্ছা করে না, ক্লাসে বসে থাকতে থাকতে মাথা ঝিমঝিম করে, আর সিঁড়ি দিয়ে দুই তলা উঠতেই বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যায়। বাসার সবাই বলে, “পড়াশোনার চাপ”, “একটু বিশ্রাম নে।”
কিন্তু রক্ত পরীক্ষা করানোর পর দেখা গেল আসল কারণটা অন্য জায়গায়। শরীরে আয়রনের মাত্রা প্রয়োজনের অনেক নিচে নেমে গেছে। মিতুর গল্পটা একেবারে একা কারও গল্প নয়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটির বেশি মানুষ আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতায় ভোগে; আর এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটাই শিশু, গর্ভবতী নারী এবং তরুণীদের।
ব্যাপারটা বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে শরীরের ভেতর আসলে কী ঘটছে1 —
রক্তে হিমোগ্লোবিন নামের একটা উপাদান থাকে, যার কাজ ফুসফুস থেকে অক্সিজেন নিয়ে শরীরের প্রতিটা কোষে পৌঁছে দেওয়া। এই হিমোগ্লোবিন তৈরি হতে আয়রন লাগে। আয়রন কমে গেলে হিমোগ্লোবিন ঠিকমতো তৈরি হয় না, কোষগুলো পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। আর তখনই তৈরি হয় সেই চেনা ক্লান্তি, দুর্বলতা আর মাথা ঘোরার অনুভূতি। তরুণীদের মধ্যে এই সমস্যা এত বেশি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণটা আসলে আমাদের সবারই জানা, শুধু গুরুত্ব দেওয়া হয় না। প্রতি মাসের নিয়মিত মাসিক।
এই রক্তক্ষরণের মাধ্যমে শরীর থেকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়রন প্রতি মাসেই বেরিয়ে যায়; আর যাদের রক্তক্ষরণ তুলনামূলক বেশি, তাদের ঘাটতিও দ্রুত তৈরি হয়। এর সাথে যোগ হয় খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম। অনেকে ওজন কমানোর তাড়নায় মাংস বা ডিম এড়িয়ে চলেন; কেউ আবার পড়াশোনা বা চাকরির চাপে সকালের নাস্তাটাই বাদ দিয়ে দেন। যেসব পরিবারে খাদ্যনিরাপত্তা কম বা মায়ের শিক্ষার সুযোগ কম ছিল, সেসব পরিবারের মেয়েদের মধ্যেও এই ঘাটতি তুলনামূলক বেশি দেখা যায় বলে জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপগুলোতে বারবার উঠে এসেছে। এমনকি ভিটামিন এ বা জিংকের ঘাটতি থাকলেও শরীরের আয়রন শোষণ ক্ষমতা কমে যায়, একটা ঘাটতি প্রায়ই আরেকটাকে টেনে আনে। পরীক্ষার চাপ, রাত জাগা কিংবা অনিয়মিত জীবনযাপনও পরোক্ষভাবে খাওয়াদাওয়ার প্যাটার্ন এলোমেলো করে দিয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
মজার ব্যাপার হলো, শুধু আয়রনযুক্ত খাবার খেলেই এই ঘাটতি পূরণ হয়ে যায় না। কী দিয়ে এবং কখন খাচ্ছেন, সেটাও প্রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাংস, মাছ, মুরগি বা কলিজায় থাকা আয়রনকে বলে হিম আয়রন, যা শরীর সহজে শোষণ করতে পারে। অন্যদিকে পালং শাক, মসুর ডাল, ছোলা বা খেঁজুরে থাকে নন-হিম আয়রন, যা শোষিত হতে একটু বেশি কাঠখড় পোড়াতে হয়। তবে লেবু, কমলা বা আমলকীর মতো ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার এই নন-হিম আয়রনের শোষণ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই দুপুরে ডাল-ভাত খাওয়ার সময় পাতে এক টুকরা লেবু চিপে নিলে সেই ডালের আয়রন শরীর অনেক ভালোভাবে গ্রহণ করে।
কিন্তু ঠিক এখানেই আমাদের অতি পরিচিত একটা অভ্যাস প্যাঁচ লাগিয়ে দেয়, ভাত খাওয়ার পরপরই এক কাপ চা খাওয়া। গবেষণা বলছে, চা বা কফি খাবারের সাথে বা খাওয়ার পরপরই খেলে আয়রন শোষণ ৫০-৯০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে।2 এর মানে চা-কফি একেবারে বাদ দিতে হবে তা নয়, শুধু খাবারের অন্তত এক-দুই ঘণ্টা আগে বা পরে খেলেই এই ক্ষতি এড়ানো যায়। একইভাবে দুধ বা দইয়ের মতো ক্যালসিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার আয়রন-সমৃদ্ধ খাবারের সাথে একসাথে বেশি পরিমাণে খেলেও শোষণে বাধা পড়ে, আর শুধু শাকসবজির উপর ভরসা করলেও চলবে না, কারণ এতে থাকা ফাইটিক অ্যাসিড ও পলিফেনল আয়রনের শোষণে বাধা দেয়। এজন্যই এখন গবেষকরা জোর দিচ্ছেন খাবারের সঠিক সংমিশ্রণের উপর। শুধু কী খাচ্ছি নয়, বরং কীসের সাথে খাচ্ছি সেটাই আসল কথা।
সবসময় ক্লান্তি লাগা, সামান্য কাজেই হাঁপিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, পড়াশোনা বা কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, ত্বক ও চোখের নিচের অংশ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত চুল পড়া, এমনকি ঘুমের মধ্যে পায়ে অস্বস্তি অনুভব করা। কারও কারও ক্ষেত্রে মাটি, বরফ বা চক খাওয়ার মতো অস্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলে “পিকা”। এই লক্ষণগুলোর একটা-দুটো মাঝেমধ্যে দেখা দিলে ঘাবড়ানোর দরকার নেই, তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে বেশ কয়েকটা একসাথে থাকলে সেটাকে অবহেলা না করে একবার রক্ত পরীক্ষা করিয়ে হিমোগ্লোবিন আর ফেরিটিনের মাত্রা দেখে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ, মিতু যেমনটা করেছিল।
চিকিৎসার দিক থেকে দেখলে, আয়রন-ঘাটতি রক্তশূন্যতার প্রচলিত চিকিৎসা হলো মুখে খাওয়ার আয়রন সাপ্লিমেন্ট, বিশেষ করে ফেরাস সালফেট। এটা সস্তা ও কার্যকর, কিন্তু সমস্যা হলো শরীর একবারে খুব বেশি আয়রন শোষণ করতে পারে না বলে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি ডোজ খেতে হয়, আর তাতে অনেকের পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। এই অস্বস্তির কারণেই অনেকে মাঝপথে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন আর সমস্যাটা আবার ফিরে আসে। এই জায়গা থেকেই গবেষকরা এখন নতুন ধরনের আয়রন ফর্মুলেশন নিয়ে কাজ করছেন। যেমন অ্যামিনো অ্যাসিড-চিলেটেড আয়রন, যা সাধারণ আয়রন সল্টের চেয়ে সহজে শোষিত হয় ও পেটে কম সমস্যা করে, কিংবা লাইপোজোমাল ও সুক্রোসোমিয়াল আয়রনের মতো বিশেষ প্যাকেজিং, যা আয়রনকে পাকস্থলীর সরাসরি সংস্পর্শ থেকে খানিকটা রক্ষা করে অস্বস্তি কমিয়ে দেয়। যাদের ক্ষেত্রে মুখে খাওয়া আয়রনে কাজ হয় না বা রক্তস্বল্পতা গুরুতর পর্যায়ে চলে যায়, তাদের জন্য শিরাপথে আয়রন দেওয়ার আধুনিক পদ্ধতিও এখন আগের চেয়ে অনেক নিরাপদ ও দ্রুত কার্যকর। তবে কোনো আয়রন সাপ্লিমেন্ট নিজে থেকে শুরু করা ঠিক নয়, কারণ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আয়রন শরীরে জমে গেলে সেটাও সমান ক্ষতিকর! তাই ডাক্তারের পরামর্শ আর রক্ত পরীক্ষার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
মিতু শেষমেশ যেটা করেছিল, সেটা খুব বড় কিছু ছিল না। সকালের নাস্তাটা আর বাদ দেয়নি, তাতে একটা ডিম বা অল্প ডাল রাখা শুরু করেছিল। দুপুরের ডাল-ভাতের পাশে এক টুকরা লেবু রাখতে শুরু করে, আর ভাত খাওয়ার সাথে সাথেই চায়ের কাপে চুমুক না দিয়ে একটু অপেক্ষা করতে শেখে। ডাক্তারের পরামর্শে কিছুদিন আয়রন সাপ্লিমেন্টও খেয়েছিল, তবে নিজের ইচ্ছেমতো না, প্রেসক্রিপশন মেনে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় বুক ধড়ফড় করাটা কমে আসে, ক্লাসে বসে থাকতেও আর আগের মতো মাথা ঝিমঝিম করে না।
- এটি একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক লেখা ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন! ↩︎
- Ebea‐Ugwuanyi, P. O., Vidyasagar, S., Connor, J. R., Frazer, D. M., Knutson, M. D., & Collins, J. F. (2024). Oral iron therapy: Current concepts and future prospects for improving efficacy and outcomes. British journal of haematology, 204(3), 759-773. ↩︎
